Tuesday, 15 May 2012

এক জন্ম


এক জন্ম

তারাপদ রায়



অনেকদিন দেখা হবে না
তারপর একদিন দেখা হবে।
দু'জনেই দুজনকে বলবো,
'অনেকদিন দেখা হয়নি'।
এইভাবে যাবে দিনের পর দিন
বৎসরের পর বৎসর।
তারপর একদিন হয়ত জানা যাবে
বা হয়ত জানা যাবে না,
যে
তোমার সঙ্গে আমার
অথবা
আমার সঙ্গে তোমার
আর দেখা হবে না।

আমার ভাঙ্গা কান্নাগুলো


আমার ভাঙ্গা কান্নাগুলো

তাসলিম রেজা



তাহাকে ভালবাসিবার লোভ আমি সামলাইয়াছি
যখন আদি-অন্তের সেতুর মাঝখানে দাঁড়াইয়া
ভালবাসার পদ্ম-জলে দেখিয়াছি
... লাল-লাল নীল-নীল ছোপ-ছোপ স্বার্থ!
যে চলিয়া যাইবে তাহাকে জড়াইয়া রাখিবার স্বার্থ নয়
এই স্বার্থ যে চলিয়া গেল তাহার মঙ্গল কামনায় প্রদীপ জ্বালাইবার
অথবা তাহার রাখিয়া যাওয়া ছায়া-অনলে নিজে জ্বলিবার।
স্মৃতিরা আজন্ম জ্বলিয়াই গেল, তবু ছাই হইল না

উর্বর দেহ-জমিনে বালুকা-মন লইয়া যাহারা চলিল
তাহারা প্রেমিক
প্রেমিকদের ভালবাসা ঘন্টাব্যাপী বিছানা ভ্রমণ
প্রেমিকদের চুম্বনের দাগ স্নানের প্রথম জলেই খসিয়া যায়
তাহাকে প্রেমিক প্করিবার সকল আয়োজন বিসর্জন দিয়াছি
যখন দেখিয়াছি হৃদয় হইতে তাহার দেবতা প্রিয় হাস্য মুখ
জীবনব্যাপী বরষার জলেও মুছিবে না

আমি সহস্র পুরুষের শার্টের কামুক গন্ধ নাকে শোঁকাইয়া বলি নাই
আমি সাধু
আমি একজন পুরুষের এক মুঠো ভালবাসা চাহিবার দন্ডে দন্ডিত
যাহার কাছে গোটা পৃথিবী এক খাঁচা শূন্য কারাগার, তাহাকে
প্রভু কোন কারাগারের ভয় দেখাইলেন তবে?
... আমার ধারাল কষ্টে হৃদয় ফাড়িয়া ছিন্ন, আর আমি বসিয়া কান্না ভাঙ্গি
যখন আমার ভাঙ্গা কান্না আরও ভাঙ্গিল, কান্নার টুকরা সাজাইয়া লিখিলাম-
তাহাকে ভালবাসিব বলিয়াই ভাল না বাসিবার শপথ; অস্থি-মাংস-মজ্জায়......

এখনো তুমি


এখনো তুমি

তসলিমা নাসরিন



ভালোবাসা বলতে এখনো তোমাকেই বুঝি
ঘৃণা বলতে এখনো তোমাকে
সংসার বলতে এখনো তোমাকে বুঝি
সুখ বলতেও আমি এখনো তোমাকে
কত টুকু পশু আছে, কতটা হিংস্রতা
কতটা দানব থাকে একজন মানুষের দেহে
তোমাকে আমল ছুঁয়ে যেনে, আমি সমস্ত জেনেছি
তোমার তকের নিচে কত টুকু ক্লেদ
কতটা দ্রুদতা
চোখের তারায় তুমি কতটা রুখ পাপ
শরীলের ঘ্রাণ শুকে শুকে আমি সকল বুঝেছি
স্বপ্ন বলতে এখনো তোমাকেই বুঝি
কষ্ট বলতে এখনো তোমাকে
চুম্বনে তোমার লালা থেকে চুষে নেই
সংক্রামক ব্যাধি

তোমাকে আরোগ্য করি
তোমাকে শুশ্রূষা করি
তোমাকে নির্মাণ করি আমার বিনাশে
জীবন বলতে এখনো তোমাকে বুঝি
মৃত্যু বলতেও আমি এখনো তোমাকে।

কত ভালবাসি


কত ভালবাসি

কামিনী রায়




জড়ায়ে মায়ের গলা শিশু কহে আসি-
"মা তোমারে কত ভালবাসি।"
"কত ভালবাস ধন ?" জননী সুধায়।
... "এ-তো-" বলি দুই হাত প্রসারি দেখায়।

"তুমি মা আমারে ভালবাস কত খানি ?"
মা বলেন, "মাপ তার আমি নাহি জানি।"
"তবু কতখানি, বল !" "যতখানি ধরে
তোমার মায়ের বুকে।" "নহে তার পরে ?"
"তার বাড়া ভালবাসা পারিনা বাসিতে"
"আমি পারি।" বলে শিশু হাসিতে হাসিতে।

আমি তো বলিনি


আমি তো বলিনি

এলিনা নাহার



আমি তো বলিনি
রাস্তার পাশের ঐ সুন্দর বাড়িটার মত
আমার একটা বাড়ি চাই,
... শুধু বলেছি
পাশে রেখ সারাজীবন ।

আমি তো বলিনি
রুনা ভাবির মত
আমাকেও একটা স্বর্নের হার গড়ে দাও,
শুধু বলেছি
নীল পাড়ের একটা তাঁতের শাড়ি কিনে দিও ।

আমি তো বলিনি
আমার নিজেদের একটা গাড়ি চাই,
শুধু বলেছি
হুডখোলা রিকশায় রাতের আকাশ
দেখতে ভীষণ ভালো লাগে ।

আমি তো বলিনি
আমি পৃথিবী ঘুরতে চাই,
শুধু বলেছি
সামর্থ্য হলে একবার সাগর দেখিয়ে এনো ।

তবে কেন তোমার এই ব্যস্ততা,
উপরে উঠবার এই নেশা,
যে তোমাকেই হারিয়ে ফেলছি 'তোমার' থেকে!

Wednesday, 9 May 2012

জীবনের হিসাব


জীবনের হিসাব

সুকুমার রায়



বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই চড়ি সখের বোটে
মাঝিরে কন , “বলতে পারিস্ সূর্যি কেন ওঠে?
চাঁদটা কেন বাড়ে কমে? জোয়ার কেন আসে?”
বৃদ্ধ মাঝি অবাক হয়ে ফ্যাল্ফেলিয়ে হাসে।

বাবু বলেন, “সারা জনম মরলিরে তুই খাটি,
জ্ঞান বিনা তোর জীবনটা যে চারি আনাই মাটি!”
খানিক বাদে কহেন বাবু,”বলত দেখি ভেবে
নদীর ধারা কেম্নে আসে পাহাড় হতে নেবে?

বল্ত কেন লবনপোরা সাগরভরা পানি?”
মাঝি সে কয়, “আরে মশাই , অত কি আর জানি?”
বাবু বলেন, “এই বয়সে জানিসনেও তাকি?
জীবনটা তোর নেহাৎ খেলো, অষ্ট আনাই ফাকি।”

আবার ভেবে কহেন বাবু, “বলতো ওরে বুড়ো,
কেন এমন নীল দেখা যায় আকাশের ঐ চুড়ো?
বল্ত দেখি সূর্য চাঁদে গ্রহণ লাগে কেন?”
বৃদ্ধ বলে, “আমায় কেন লজ্জা দেছেন হেন?”

বাবু বলেন, “বলব কি আর, বলব তোরে কি তা,-
দেখছি এখন জীবনটা তোর বারো আনাই বৃথা।”
খানিক বাদে ঝড় উঠেছে, ঢেউ উঠেছে ফুলে,
বাবু দেখেন নৌকাখানি ডুব্ল বুঝি দুলে।

মাঝিরে কন, “একি আপদ! ওরে ও ভাই মাঝি,
ডুব্ল নাকি নৌকো এবার ? মরব নাকি আজি?”
মাঝি শুধায়, “সাঁতার জানো? মাথা নাড়েন বাবু”
মুর্খ মাঝি বলে, “মশাই , এখন কেন কাবু?
বাঁচলে শেষে আমার কথা হিসেব কারো পিছে,
তোমার দেখি জীবনখানা ষোল আনাই মিছে!”

প্যাঁচা আর প্যাঁচানি


প্যাঁচা আর প্যাঁচানি

সুকুমার রায়



প্যাঁচা কয় প্যাঁচানি,
খাসা তোর চ্যাঁচানি!
শুনে শুনে আন্‌‍মন
নাচে মোর প্রাণমন!
মাজা‐গলা চাঁচা সুর
আহ্লাদে ভরপুর!
গল‐চেরা গমকে
গাছ পালা চমকে,
সুরে সুরে কত প্যাঁচ
গিট্‌‍কিরি ক্যাঁচ্ ক্যাঁচ্!
যত ভয় যত দুখ
দুরু দুরু ধুক্ ধুক্,
তোর গানে পেঁচি রে
সব ভুলে গেছি রে—
চাঁদামুখে মিঠে গান
শুনে ঝরে দু’নয়ান।