Showing posts with label আবিদ আজাদ. Show all posts
Showing posts with label আবিদ আজাদ. Show all posts

Thursday, 19 April 2012

যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না


যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না

আবিদ আজাদ




যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে যুদ্ধ শেষের
ভাঙা-পোড়ো একটা এয়ারপোর্টের মতো বেঁচে থাকবে তুমি
তোমাকে ঘিরে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে স্কার্ট পরা বুড়ি-
বার্মিজ মহিলার মতো ভৌতিক নির্জনতা;
তোমাকে ঘিরে সারাক্ষণ ঝুলে থাকবে তছনছ তারের জটিলতা
লতাগুল্মময় ক্রেনের কংকাল, জং পড়া লোহালক্কর আর হিংস্র
ঘাসের মধ্যে ধু-ধু করবে তোমার জীবন
ভয়ার্ত সব মিলিটারী ভ্যান আর উল্টে থাকা ট্রলির পাশে ক্ষত-বিক্ষত
একটা চাঁদ ওঠা রানওয়ের মতো
তুমি মুখ লুকিয়ে রাখবে গা ছম-ছম করা জ্যোৎস্নায় ।

যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে জনহীন কোন
পেট্রোল পাম্পের দেয়াল ঘেঁষে
একটা মরা শিউলি গাছের মতো বেঁচে থাকবে তুমি
তোমাকে ঘিরে হা- হা করবে নিদাঘ রাত
দেখবে পর্যুদস্ত একটা হেলমেটের ফাটল দিয়ে দিয়ে মাথা
তুলছে একগুচ্ছ সবুজ তৃণ
শুনবে ধ্বংস্তুপের মধ্যে অর্ধডোবা সূর্যাস্তের মতো
আগুনলাগা বিলুপ্তপ্রায় লাউঞ্জ থেকে ভেসে আসছে
প্রেত হাসির শব্দ
তোমাকে ঘিরে নামবে এক জোড়া জনশূন্য বুটের স্তব্ধতা ।
যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে প্রতিদিন
দুর্ঘটনা দিয়ে শুরু হবে তোমার ভোর
সকাল সাতটা থেকে অনবরত টেলিফোন আসতে থাকবে
‘সান স্ট্রোকে’র সংবাদ
তোমার পাশের সাততলা জানলা থেকে লাফিয়ে পড়বে
কোঁকড়া চুলের যুবক
একদিন গলায় খুর চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে পড়বেন সেই বুড়ো
সবুজ রঙ্গের গলাবন্ধ পরে স্টিক হাতে যিনি মর্নিংওয়াকে
বেরুতেন রোজ
একটি কিশোরী তার আব্বার রেজর থেকে লুকিয়ে নেবে ব্লেড
গভীর জ্যোৎস্নাঙ্কিত স্ট্রীটের মাথায় হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়বে
কালো রঙ্গের একটি গাড়ি
একজন মানুষ শিরিষ গাছের ভিতরে টিপে ধরবে আরেকজন মানুষের গলা
পার্কের ঝরাপাতার উপর সারারাত ধরে শিশিরে ভিজে যাবে
মৃত তরুণীর হাঁটুর ভাঁজ ।
যে শহরে আমি নাই আমি থাকবো না সে শহরে চরম
দুর্বোধ্যতম হয়ে বেড়ে ওঠবে তোমার বিষন্ন সন্তান
বার বার ক’রে বদলাতে হবে তার ঝাপসা চোখের চশমার গ্লাস
তুমি তাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে ভোরের ইস্কুলে

কিন্তু কাঁধে ব্যাগ নিয়ে আর কোনদিন ফিরে আসবে না
নীল হাফ প‌্যান্ট পরা তোমার ছেলে, আসবে না , আসবে না
তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে ইস্কুল বাড়ির সামনে, রাস্তার ওপারে ।

যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে নিয়মিত
দুধের বোতল দিয়ে যাবে গাড়ি
কিন্তু সে দুধে মেশানো থাকবে গুঁড়ো বিষ
তোমার ফ্রিজের ভিতরে মরে পরে থাকবে শাদা ইঁদুর
তোমার ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় বসে থাকবে একটা তেলাপোকা
তার রঙ হবে মারাত্মক রকম লাল
তোমার ওয়ারড্রোবের ভিতর থেকে হ্যাঙ্গার শুদ্ধ ঝাঁপিয়ে পড়বে মধ্য রাতে কাপড়-চোপড় ।
তুমি পালাতে চাইবে পালাতে চাইবে পালাতে চাইবে
ছুটে পালাবে
ছুটবে
ছুটতে ছুটতে ছুটতে তুমি নিচতলার জানালার একখন্ড পর্দার
মতো আটকে যাবে বারবার
তুমি উদ্র্ধশ্বাসে ছুটে পালাবে ঘুমের ভিতর
কিন্তু মৃতশহর শাণিত করে রাখবে তার সমস্ত রাস্তার বালি
তারার ভিতর থেকে সারারাত ধরে খ’সে পড়বে চূন
হঠাৎ লক্ষ লক্ষ হাতের করতালি বেজে উঠবে আতংকিত মোড়ে মোড়ে
দেখেব শাদা ট্রাফিক দাঁড়িয়ে আছে বাজপড়া তাল গাছের মতো
তার হাত দু’টো ঝুলছে চাঁদহীন মরা ডালের মতো
চোখে লোমহর্ষক দুটো গর্তের ভিতর দিয়ে চলেছে
বিষাক্ত পিঁপড়ের বাহিনী
তার মাথার ফাটলে গজিয়েচে একটা বটচারা
তোমার ভয়ার্ত চিৎকারে শুধু সেই মৃত ট্রাফিকের লাল
হা-এর ভিতর থেকে উড়ে যাবে একটা বনটিয়া ।
যে শহরে আমি থাকবো না সে শহরে
লিফট তোমাকে নিয়ে নেমে যাবে পাতালে
তোমাকে নিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো
পার্কের ধারের খাদে ছিটকে পড়বে বাস

লেকের হাঁসগুলি গুগলির মতো ঠুকরে খাবে মানুষের চোখ
আর খুব বিকাল বেলায় তুমি ক্লান্ত হ’য়ে
ক্লান্ত হ’য়ে
ক্লান্ত হ’য়ে
ফিরবে ঘরে
কিন্তু তোমার ঘরের নিঃসঙ্গ দরোজা
তোমাকে খুলে দিবে হু -হু শীতার্ত প্রান্তর
তোমার সোফা তোমাকে বসতে দিবে না
পাঠিয়ে দেবে বিছানায়
কিন্তু বিছানা তোমাকে শুতে দেবেনা
দাঁড় করিয়ে রাখবে হিমশীতল জানালায়
তুমি বাথরুমে যাবে, শাওয়ার খুলে দিলে ঝরবে রক্ত
তুমি বেসিনে নুয়ে পড়বে, পানির ঝাপ্টা দিতেই মনে হবে
কার গলা যেন পাটিয়ে দিচ্ছে যক্ষার ফুল
তুমি ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে,
দেখবে বিভৎস চিড় ধ’রে আছে আয়নায় ।
সেই চিড় ধরা আয়নার ভিতরে তারপর ক্রমশঃ
হারিয়ে যাবে তোমার আর্তনাদ
আর তোমার মনে হবে , আমি নেই ।

Wednesday, 18 April 2012

এখন যে কবিতাটি লিখবো আমি


এখন যে কবিতাটি লিখবো আমি

আবিদ আজাদ



এখন যে কবিতাটি লিখবো আমি
           এক্ষুণি সেই কবিতাটি বাজেয়াপ্ত করা হবে
এক্ষুনি বেআইনি বলে ঘোষিত হবে সেই কবিতার
           প্রতিটি শব্দ
           প্রতিটি দাঁড়িকমা
           প্রতিটি সেমিকোলন।
নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হবে সেই কবিতার আপাদমস্তক চরণপুঞ্জ।

এখন যে কবিতাটি লিখবো আমি
           তার জন্যে মুহূর্তের মধ্যে সারাদেশ জুড়ে নেমে আসবে আরও
     একটি উত্থানের প্রাক-মুহূর্তের স্তব্ধতা
           নেমে আসবে রাইফেলের নলের মতো
     মৃত্যু -
আর সেই মৃত্যুর স্তব্ধতায় বাংলাদেশের আবহমান সবুজ রঙ
           অন্ধকারের মতো কালো হ’তে হ’তে ভয়াল গর্জনে ফেটে পড়বে
     সমুদ্রের মতো।

এখন যে কবিতাটি লিখবো আমি
           তার জন্যে হঠাৎ বোমাবাজির পর
           ভরদুপুরের ভৌতিক গলির মতো শান্ত হয়ে যাবে
           আমাদের প্রিয়তম এই রাজধানী, এই ঢাকা
           বাজতে থাকবে চারিদিকে বুটের আওয়াজ
     শুধু বুটের
     আওয়াজ

এখন যে কবিতাটি লিখবো আমি
           তার জন্যে নিমিষের মধ্যে সারা শহর জুড়ে শুরু হয়ে যাবে
     খানাতল্লাশি
           তার জন্যে আর্মি-ইন্টেলিজেন্স রুম থেকে দিকে দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে
     গোপন নির্দেশ।
           তার জন্যে বন্ধ করে দেওয়া হবে বিমানের সব নির্দিষ্ট ফ্লাইট
           তার জন্যে গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে দেয়া হবে নির্মম সন্ত্রাস 
           তার জন্যে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে সারাদেশে জারি হয়ে যাবে জরুরি অবস্থা -

এখন যে কবিতাটি লিখবো আমি
           তার জন্যে এক্ষুণি রাস্তায় রাস্তায় বসে যাবে চেকপোষ্ট
           শাহবাগের মোড়ে
           টিকাটুলির তেমাথায়
           ফার্মগেটের সামনে থামিয়ে দেওয়া হবে
           সব চলন্ত বাস, কোচ আর কোস্টার
           লাইন করে দাঁড় করিয়ে দেয়া হবে সারি সারি রিকশা ও ঠেলাগাড়ি।

আর মুহূর্তের মধ্যে শুরু হয়ে যাবে জোর তদন্ত
           আবার সার্চলাইট ঝলসে উঠবে বাংলার খালে বিলে নদী নালায়
           চেক করা হবে সন্ত্রস্ত যাত্রীদের শরীর
           চেক করা হবে মহিলার চামড়ার ব্যাগ
           চেক করা হবে কিশোরের খেলার বল
           চেক করা হবে গাড়ির পাদানির নিচ থেকে কার্পেটের অতল অবধি
           চেক করা হবে সাইকেলচারী যুবকের প্লাস্টিকের থলি
           চেক করা হবে বেতার-ভবনের গেটে ঘোষিকার কণ্ঠ
           তরুণ কবির বুকপকেট,
           বলপেনের দাগভরা আঙুলের ভাঁজ
           কেরানির খাতা
           অধ্যাপকের উড়োচুল
           কৃষকের কোঁচড়
           শ্রমিকের চোখ
           পাড়াগাঁর স্কুল
           গঞ্জের ক্যানভাসারের গলা
           হকারের বগল
           গরু-পাইকারের খতি
           বেশ্যাপাড়ার দাগী-খুনির লুঙ্গির গাঁট
           সেন্ট্রাল জেলের কনডেমড সেল
           রেশনকার্ডের মলিন পরত
           এমনকি মুদ্দাফরাশের জবানবন্দির ভেতরেও চলবে তল্লাশি

এখন যে কবিতাটি লিখবো আমি
           তার গতি রোধ করতে গিয়ে সীমান্ত পুলিশের হাতে
      ধরা পড়বে কয়েক লক্ষ টাকার গুইসাপের চামড়া
           তার গতি রোধ করতে গিয়ে সীমান্তরক্ষীর হাতে
           আটকা পড়বে তিনজন চোরাচালানিসহ কয়েক লক্ষ টাকার
      বিদেশী শাড়ি

এখন যে কবিতাটি লিখবো আমি
           তার জন্যে মুহূর্তের মধ্যে ছদ্মবেশে টহল দিতে শুরু করবে পুলিশভ্যান
           তার জন্যে তছনছ হয়ে যাবে ইউনিভার্সিটির হল
           তার জন্যে প্রচন্ড সন্ধ্যাবেলা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের
           টিভি রুমের ভিতর থেকে সন্দেহবশত ধরে নিয়ে যাবে দুজন ছাত্রকে
           তার জন্যে বস্তিতে বস্তিতে আগুনের মতো
           লেলিয়ে দেয়া হবে গুন্ডাপান্ডা -

এখন যে কবিতাটি লিখবো আমি
           সেই কবিতাটি যখন পড়বে কোনো এক পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা
আমি জানি তার ব্যর্থ কাঁধের পাশে দাঁড়িয়ে অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ
      তখন ফেলবে দীর্ঘশ্বাস
           সেই কবিতাটি যখন পড়বেন চশমার-কাচ-ফাটা গ্রামের কোনো এক
      প্রৌঢ় ইস্কুল মাস্টার
আমি জানি তার শূন্য চোখের সামনে তখন ভেসে উঠবে
           এক শীতের ভোরে শিমুলগাছের নিচে উদ্ধার-করা তার হঠাৎ
      নিখোঁজ হয়ে-যাওয়া ছেলের লাশ -
           সেই কবিতাটি যখন পড়বে কোনো এক কলেজছাত্রী
আমি জানি তখন তার মনে পড়বে প্রেমিকের উষ্ণ চুম্বনের ভিতরে
      আবিস্কার করা
           প্রথম পৃথিবী প্রদক্ষিণের আলোড়ন নয়
           তার মনে পড়বে পলায়নপর এক যুবকের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কথা -
           সেই কবিতাটি যখন পড়বেন কোনো এক চল্লিশোত্তীর্ণা মহিলা
আমি জানি তার বিগত দিনের পশমকাঁটায় তখন জেগে উঠবে শুধু
      আকণ্ঠ পরিতাপ
           সেই কবিতাটি যখন পড়বেন কোন এক বজ্জাত অধ্যাপক
আমি জানি তখন তার মনে পড়বে তার হওয়ার কথা ছিল পুলিশ
           কিন্তু তিনি হয়ে গেছেন অধ্যাপক -
           সেই কবিতাটি যখন পড়বেন কোনো এক পত্রিকার সম্পাদক
আমি জানি তখন ঘুমের মধ্যে তার মাথার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসবে
      একটি ছায়ামূর্তি
           আর তার মনে পড়বে – তার হওয়ার কথা ছিল সওদাগরি
      অফিসের অ্যাকাউন্টেন্ট
           কিন্তু তিনি হয়ে গেছেন সম্পাদক

এখন যে কবিতাটি লিখব আমি
           তার জন্যে দৈনিক পত্রিকাগুলোর নাইট শিফটের টেবিলে টেবিলে
           গুঞ্জরিত হয়ে ফিরবে ফিসফিসে চাপাগুঞ্জন
           তার জন্যে চাকরি যাবে তথ্য সচিবের
           তার জন্যে বিনিদ্র পায়চারী শুরু হবে স্বরাষ্ট্র সচিবের
           তার জন্যে রাত তিনটেয় টেলিফোনের রিসিভার হাতে কাঁপতে
     থাকবেন পুলিশের আই জি
           তার জন্যে আপন পদে ইস্তফা দেবেন তথ্যমন্ত্রী

এখন যে কবিতাটি লিখব আমি
           তার জন্যে অপেক্ষা করছে
     দুটো লোহার ঠান্ডা হাতকড়া
           তার জন্যে অপেক্ষা করছে
     একটি চকচকে ঘাতক ছুরি
           তার জন্যে অপেক্ষা করছে
     ভাড়া করা মাস্তানদের একটি কালো গাড়ি।
           তার জন্যে অপেক্ষা করছে
     ক্যান্টনমেন্টের একটি রক্তপায়ী বাড়ি
           তার জন্যে অপেক্ষা করছে
     কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের একটি হিংস্র চেয়ার
           তার জন্যে অপেক্ষা করছে
     উচ্চাভিলাষী কয়েকজন জেনারেলের ষড়যন্ত্রের একটি
     নির্মম নির্জন মধ্যরাত-

এখন যে কবিতাটি লিখব আমি
           তার জন্যে আমার সন্তানের জন্মের যন্ত্রণা মুখে নিয়ে
     আমার প্রিয়তমা নারীর মতো
     অপেক্ষা করছে আমার বাংলাদেশ।


খিড়কি


খিড়কি

আবিদ আজাদ



খিড়কি ছিলো পাশের বাড়ির
খিড়কি ছলো মনের
খিড়কি ছিলো যখন তখন
খিড়কি কিছুক্ষণের।

খিড়কি ছিলো পথের পাশে
হলুদ গাঁদাফুলের
খিড়কি ছিলো আকাশ ভরা
মেঘের কালোচুলের।

খিড়কি ছিলো তোমার মনে
যখন খুশি খোলার
খিড়কি ছিলো সময়মতো
আমার কথা ভোলার।

খিড়কি আছে বুকের কাছে
খিড়কি আছে মনের
খিড়কি আছে ঘুমিয়ে পড়ার
খিড়কি জাগরণের।